Netrokona is a district in northern Bangladesh. It is a part of Mymensingh Division.

Netrokona is situated in the northern part of Bangladesh, near the Meghalayan border. There are five main rivers in Netrokona: Kangsha,Someshawri,Dhala, Magra, and Teorkhali.

Netrokona Pouroshabha (Town of Netrokona) is a municipal town, established in 1887 and with an area of 13.63 km².

Netrokona City at a glance:

Division: Mymensingh Division

Area: 2,794.28 km2 (1,078.88 sq mi)

Population:2,229,642

Density: 800/km2 (2,100/sq mi)

Demonym(s): Netrokoni, Netrokonese

Time zone:UTC+6(BST)

Website: http://www.netrokona.gov.bd/

মুক্তিযুদ্ধের পর নেত্রকোণা জেলার উন্নয়নঃ

অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার ইতিহাস বাঙ্গালি জাতির অনেক পুরানো। নেত্রকোণার স্বাধীনচেতা বীর জনগোষ্ঠী ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নেত্রকোণার রণাঙ্গনগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় তৎকালীন নেত্রকোণা মহুকুমার ৫০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাৎ বরণ করেছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন নেত্রকোণার মুক্তিযোদ্ধারা শুধু নেত্রকোণায় যুদ্ধ করে শহীদ হননি, দেশের বিভিন্ন জেলার রণাঙ্গনগুলোতে নেত্রকোণার মুক্তিযোদ্ধারাও যুদ্ধ করেছেন এবং অনেকে শহীদও হয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধ অন্তবর্তীকালীন সময়ে ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোণা জেলার বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ

আন্তজেলা যোগাযোগ ব্যবস্থা্র উন্নয়নে নেত্রকোণা জেলা নব উচ্চতায় পৌছে গিয়েছে। প্রায় ১৮৩ কিঃ মিঃ নেত্রকোণা-ময়মনসিংহ লোকাল ট্রেন সার্ভিস এবং নেত্রকোণা থেকে ঢাকা আন্তঃ নগর ও লোকাল ট্রেন সার্ভিস চালু হয়েছে। প্রায় ১৬২ কিঃমিঃ নতুন রাস্তা নেত্রকোণা জেলার সাথে ঢাকার যোগাযোগ গতিশীল করেছে। নেত্রকোণা জেলার সাথে উপজেলাগুলোর অভ্যন্তরীণ রাস্তার উন্নয়নও হয়েছে লক্ষণীয় মাত্রায় ।

হোটেল ও আবাসনের উন্নয়নঃ

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি প্রভাব ফেলেছে জেলার হোটেল ও আবাসন ব্যবসায়ও। বর্তমানে ৯টি সরকারি হোটেল ও আবাসন এবং ১১টি বেসরকারী হোটেল ও আবাসন রয়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নঃ

জেলার প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে অন্যতম হলো এর মৎস্য সম্পদ। বিরল প্রজাতির ও অত্যন্ত পুষ্টিকর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় যার অধিকাংশ প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়ে। অসংখ্য নদ-নদী, হাওর, বিল ও ডোবায় এ মাছ পাওয়া যায়। এরপরও সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ চলছে।

জেলার একমাত্র বিসিক শিল্প নগরী প্রতিষ্ঠিত হলেও মাত্র একটি শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জেলায় নারী-পুরুষরা বিচ্ছিন্নভাবে কুটির শিল্পে কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

জেলা ব্রান্ডিংঃ

” নৈসর্গিক নেত্রকোণা ” স্লোগানকে সামনে রেখে নেত্রকোণা জেলার উন্নয়ন এবং জেলাকে ডিজিটালাইজড করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণঃ

জেলায় রয়েছে চীনামাটির পাহাড়, যার বুক চিরে জেগে উঠেছে এই নীলচে-সবুজ পানির হ্রদ। দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদ থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কুল্লাগড়া ইউনিয়নের আড়াপাড়া ও মাইজপাড়া মৌজায় বিজয়পুরে রয়েছে সাদা মাটির বিশাল সঞ্চয়। বাংলাদেশের মধ্যে প্রকৃতির সম্পদ হিসেবে সাদা মাটির অন্যতম বৃহৎখনিজ অঞ্চল এটি। সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে রিক্সা বা হোন্ডায় অর্ধ কাচা-পাকা রাস্তা দিয়ে বিজয়পুরের সাদামাটির অঞ্চলে যাওয়া যায় যা উন্নয়ণের বড় উদাহরণগূলোর একটি।

দর্শনীয় স্থান উন্নয়নঃ

জেলায় রয়েছে ১১টি দর্শনীয় স্থান। যার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে স্থানীয় সরকার।

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, নেত্রকোণাঃ

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নেত্রকোণার সমাজকে মাদক মুক্ত রাখতে সহায়ক ভুমিকা পালন করছে তথা সমাজ ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়নঃ

– মহাবিদ্যালয় ২৭টি

-শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয় ০১টি

-উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী ০১টি

– পাবলিক লাইব্রেরী-কাম-অডিটরিয়াম ০৬টি

– কারিগরী প্রতিষ্ঠান ০২টি (সরকারী ১টি এবং বেসরকারী ১টি)

অন্যান্য উন্নয়নঃ

প্রেস – ২২টি

বি,জি,বি ব্যাটালিয়ন হেড কোয়ার্টার – ০১টি

টেলিফোন অফিস – ১০টি

সাধারণ পাঠাগার – ০২টি

এল,এস,ডি গোডাউন – ১৫টি

এফ,এস, গোডাউন – ৩০টি

স্টেডিয়াম – ০১টি

–খালিয়াজুরী উপজেলা ব্যতিত সকল উপজেলায় হেলিপ্যাড রয়েছে।

মানব সম্পদঃ

কোন দেশের শ্রমশক্তিকে সে দেশের মানব সম্পদ বলে। সাধারণ অর্থে মানব সম্পদ বলতে বুঝায়,দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দিয়ে দেশের উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। উপযুক্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, চিকিৎসা সেবা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করার প্রক্রিয়াকে মানব সম্পদ বলে। দক্ষ মানব সম্পদ একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান।

আমরা যদি সম্পদের গুনাগুণ বিবেচনা করি তাহলে দেখব, সম্পদ এমন একটা বস্তু, যার মাধ্যমে আমরা দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হই, আমাদের ভূমি আছে, মূলধন আছে, যন্ত্রপাতি আছে কিন্তু উৎপাদন করার জন্য মানুষ নেই তাহলে ঐ সকল সম্পদ দিয়ে আমরা কি করতে পারব?একসময় মানুষ ভাবতো, অধিক জনসংখ্যা হলে তা দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে, কিন্তু আধুনিক যুগে এ ধারনা বদলে গেছে। পৃথিবীর সব থেকে বেশি মানুষ বসবাস করে চীন ও ভারতে। বর্তমান পৃথিবীর পরাশক্তির দেশ চীন ও ভারত। মানব সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করে তারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে ।

দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। উন্নত দেশের এটাই মূল চালিকাশক্তি। মানব সম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ৭০% দক্ষতা আসে কাজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, ২০% মিথস্ক্রিয়া ও ১০% আসে প্রশিক্ষণ হতে। বাংলাদেশ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কাজে পিছিয়ে নেই। ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি হাত দেশ গঠনে কাজ করছে। দেশের উন্নয়নে সবার অবদান রয়েছে। পল্লী গ্রামের একজন কৃষক দিনমজুর শ্রমিক তার কাজের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে অবদান রাখছে। যেমন নেত্রকোণার সোমেশ্বরী নদীতে একজন জেলে প্রতিদিন জাল ফেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে, সে আমাদের মানবসম্পদ। আবার একজন শিক্ষক তার অর্জিত জ্ঞান দিয়ে আমাদের কর্মদক্ষ করে তুলেন, তিনিও আমাদের মানবসম্পদ।

নেত্রকোণা দর্শনীয় স্থান, নদী ও হাওড় দ্বারা বেষ্টিত। রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ সম্পদ, চীনামাটির পাহাড়, যার বুক চিরে জেগে উঠেছে এই নীলচে-সবুজ পানির হ্রদ, প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত এ ভান্ডারে রয়েছে সাদামাটি এবং অবকাঠামো নির্মাণসহ কাঁচ তৈরির একমাত্র উপযুক্ত সিল্কি বালু।

নেত্রকোণা জেলার আয়তনঃ ২,৮১০ বর্গ কিঃ মিঃ

জনসংখ্যাঃ ২২,২৯,৪৬৪ জন

পুরুষঃ ১১,১১,৩০৬জন

মহিলাঃ ১১,১৮,৩৩৬জন

শিক্ষারহারঃ ৩৪.৯%

পুরুষঃ ৩৭.৯%

মহিলাঃ ৩১.৯%

নেএকোণার কৃতি সন্তানঃ

হুমায়ুন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর তাঁর মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পৈত্রিক বাড়ি নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রাম। তিনি একজন বাংলাদেশী ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার, চিত্রনাট্যকার ও চলচিত্রনির্মাতা। তিনি বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। বাংলা সাহিত্যের উপন্যাস শাখায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি প্রদত্ত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকার পর ১৯শে জুলাই ২০১২ সালে নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

মোস্তাফা জব্বার

মোস্তাফা জব্বার একজন বাংলাদেশী ব্যাবসায়ী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী। মোস্তাফা জব্বারের পৈতৃক নিবাস নেত্রকোণা জেলার খালিয়াজুড়ি উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে। ১৯৪৯ সালের ১২ আগষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার চর চারতলা গ্রামের নানার বাড়ীতে তাঁর জন্ম। ছাত্রজীবনে মোস্তাফা জব্বার রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য চর্চা, সাংবাদিকতা, নাট্য আন্দোলনের সাথে ব্যাপকভাবে জড়িত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে মোস্তাফা জব্বার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশেষ অবদান রাখা এবং বিজয় বাংলা কীবোর্ড তৈরীর জন্য দৈনিক উত্তরবাংলা পুরষ্কার, পিআইবির সোহেল সামাদ পুরষ্কার, সিটিআইটি আজীবন সম্মাননা ও আইটি এ্যাওয়ার্ড, বেসিস আজীবন সম্মাননা পুরষ্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এছাড়াও তার রয়েছে অসংখ্য শুভেচ্ছা সম্মাননা।

রবীন্দ্র সাধক শৈলজা রঞ্জন মজুমদার

নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার বাহান গ্রামে ১৯০০ খ্রীস্টাব্দে ড.শৈলজা রঞ্জন মজুমদারের জন্ম। তিনি কলকাতায় এম.এস-সি ও আইন শাস্ত্র নিয়ে পড়ালেখা করেন। পড়ালেখা শেষে তিনি নেত্রকোণা বারে যোগ দেন। ড. শৈলজা রঞ্জন মজুমদারের উদ্যোগে ১৯৩২ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতার বাইরে নেত্রকোণায় সর্বপ্রথম রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করেছিলেন। তার রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। সে কারণেই তিনি শান্তি নিকেতনে অধ্যাপনার সুযোগ পেয়েই আইন ব্যবসা ছেড়ে চলে যান। সঙ্গীতে দক্ষতা অর্জনের ফলে ১৯৩৯ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক শৈলজা রঞ্জনমজুমদারকে শান্তি নিকেতনের সঙ্গীত ভবনের অধ্য হিসেবে নিযুক্ত করেন। ২১ বছর তিনি সফলতার সঙ্গে অধ্যরে দায়িত্ব পালন করেন। রবীন্দ্র সঙ্গীতের জন্য তিনি তার নিরলস শ্রম ও নিষ্ঠা দিয়ে কাজ করেছেন। বিখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী কর্নিকা বন্দোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, নীলিমা সেন, অরুন্ধতী দেবী, সুবিনয়, আব্দুল আহাদ, অশোকতরু বন্দোপাধ্যায়, অরবিন্দ বিশ্বাস ও প্রমুখ শিল্পীরা তার কাছ থেকে তালিম নিয়েছিল। তিনি ১৯৯২ খ্রীস্টাব্দে মৃত্যু বরণ করে।

নির্মলেন্দু গুণ

নির্মলেন্দু গুণের জন্ম ২১ জুন ১৯৪৫ কাশবন, বারহাট্টা, নেত্রকোণায়। বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন হল কবি নির্মলেন্দু গুণ। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিদেরও একজন তিনি। স্বাধীনতার পূর্বে তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সাংবাদিকতায়ও জড়িত ছিলেন। তিনি প্রধানত একজন আধুনিক কবি। তিনি একাধারে অনেক গুলো পুরষ্কার লাভ করেন তার ভিতর উল্লেখযোগ্য হল বাংলা একাডেমী পদক, একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরষ্কার ।

রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ

নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া থানার পেমল গ্রামে ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সাবেক রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত আইনবিদ ও ৬ষ্ঠ প্রধান বিচারপতি এবং দু’বার দায়িত্বপালনকারী রাষ্ট্রপতি। তিনি প্রথমে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর হতে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতি হিসাবে এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় থাকা-কালীন ১৯৯৬ সালের ২৩ জুলাই থেকে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। শাহাবুদ্দিন আহমেদের কর্মজীবনের সূচনা ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে। এরপর তিনি গোপালগঞ্জ ও নাটোরের মহকুমা কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি সহকারী জেলা প্রশাসক হিসাবে পদোন্নতি পান। ১৪ই নভেম্বর, ২০০১ খ্রীষ্টাব্দে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ হতে অবসর গ্রহণ করেন।

অধ্যাপক যতীন সরকার

যতীন সরকার যিনি অধ্যাপক যতীন সরকার নামেই সমধিক পরিচিত বাংলাদেশের একজন প্রগতিবাদী চিন্তাবিদ ও লেখক। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট তারিখে যতীন সরকারের জন্ম হয় নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দপাড়া গ্রামে। আজীবন তিনি ময়মনসিংহে থেকেছেন এবং প্রধানত নাসিরাবাদ কলেজে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন।তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ তাঁর গভীর মননশীলতা ও মুক্তচিন্তার স্বাক্ষর বহন করে। ১৯৬০-এর দশক থেকে তিনি ময়মনসিংহ শহরের সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি অসাধারণ বাগ্মীতার জন্য জনপ্রিয়তা অর্জ্জন করেন। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদান করা হয়।

বারী সিদ্দিকী

বারী সিদ্দিকী ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলায় এক সঙ্গীতজ্ঞ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পরিবারের কাছে গান শেখায় হাতেখড়ি হয়। মাত্র ১২ বছর বয়সেই নেত্রকোনার শিল্পী ওস্তাদ গোপাল দত্তের অধীনে তার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। মূলত বংশী বাদক বারী সিদ্দিকী কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের প্রেরণায় নব্বইয়ের দশকে সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন এবং অল্পদিনেই বিরহ-বিচ্ছেদের মর্মভেদী গানের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন। বারী সিদ্দিকী বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ও গানের কথা লিখেছেন। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে সিদ্দিকী ফেরারী অমিতের রচনা ও পরিচালনায় পাগলা ঘোড়া নাটকে প্রথমবারের মত অভিনয় করেন। ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে ২৪ নভেম্বর তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে মৃত্যুবরণ করেন।

আরিফ খান জয়

আরিফ খান জয় ১১ মে ১৯৮০ সালে নেত্রকোণা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সংসদ সদস্য হিসাবে নেত্রকোনা-২ আসনের ২০১৪ সালে নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পার্টির একজন সদস্য। তিনি একজন প্রাক্তন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড় এবং সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের,জয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের একজন উপমন্ত্রী হিসাবে, একজন প্রাক্তন পেশাদার ক্রীড়াবিদ হিসাবে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই মন্ত্রণালয়ের দ্বায়িক্ত পান।

কবি হেলাল হাফিজ

কবি হেলাল হাফিজ ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোণা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে একজন কবি ও সাংবাদিক ছিলেন । হেলাল হাফিজ বাংলাদেশের একজন আধুনিক কবি যিনি স্বল্পপ্রজ হলেও বিংশ শতাব্দীর শেষাংশে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তার কবিতার বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ প্রকাশিত হয়। কবিতার জন্য পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ বৈশাখী মেলা উদযাপন কমিটির কবি সংবর্ধনা (১৯৮৫), যশোহর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (১৯৮৬), আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৭), নেত্রকোনা সাহিত্য পরিষদের কবি খালেদদাদ চৌধুরী পুরস্কার ও সম্মাননা প্রভৃতি। কবিতার জন্য তিনি ২০১৩ সালের বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।১৯৭৬ সালের শেষ দিকে তিনি দৈনিক দেশ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক পদে যোগদান করেন । সর্বশেষ তিনি দৈনিক যুগান্তরে কর্মরত ছিলেন।

নেত্রকোণার আদিবাসীদের জীবন বৈচিত্র্যঃ

বৈচিত্র্য এক ধরনের শক্তি যা আমাদের দেশের সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ। নেত্রকোণা জেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর মানব বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা জেলার সংস্কৃতি প্রাচীনকাল থেকেই একটু ভিন্ন।ময়মনসিংহ গীতিকার চারণভূমি, মহুয়া মলুয়া, কাজলরেখা, দেওয়ানা মদিনা কাহিনী খ্যাত, হাওড় বাওড়, নদীনালা, বিল, জলাশয়, পাহাড়, বনবাদাড়, নলখাগড়ায় ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের লীলাভূমি নেত্রকোণা। ।

নেত্রকোণার আনাচে-কানাচে বসবাস করছেন নানা জাতিগোষ্ঠির মানুষ। আদিবাসীরাও এর অন্তর্ভুক্ত। তাদের রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত নিজস্ব সংস্কৃতি। সংখ্যাগুরুর আগ্রাসী সংস্কৃতি তা বিপন্ন করে দিতে চায়। কিন্তু শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও আদিবাসীরা ধরে রেখেছেন নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বজায় রেখেছেন স্বকীয়তা। আর এই স্বকীয়তা নেত্রকোণাকে করেছে বৈচিত্র্যময়।

ঢোল, মাদল, করতাল, অগ্নিখেলায় রপ্ত, এক ভিন্ন সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যের প্রতীক বাংলার আদিবাসীরা। বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মতো নেত্রকোণাতেও কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্মরণাতীতকাল হতে বসবাস করে আসছে। এ-জেলার সর্ব উত্তরে ও পূর্বদিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দা-দুর্গাপুর এবং দক্ষিণে পূর্বধলাতে গারো, হাজং, হদি ও বানাই সম্প্রদায়ের বসবাসরত আদীবাসীর সংখ্যা প্রায় ৪৬ হাজার।

বাংলাদেশের অন্যান্য আদিবাসীদের মতো নেত্রকোণার আদিবাসীগণ বাঙালিদের মতোই হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে এবং তা পালন করে আসছে। তবে অধিকাংশ উপজাতি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হলেও এদের প্রায় প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব নাম-ধাম, আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, উৎসব-সংস্কার, চিকিৎসা পদ্ধতি, ভাষা-সংস্কৃতি ও সাহিত্য। যা তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বংশ পরম্পরায় বহন করে আসছে। তাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে জড়িত এই সংস্কৃতি মূলত অন্যদের থেকে পৃথক করে তুলেছে।

মেঘালয়ের পাহাড়সারীর পায়ের কাছে মনোলোভা লেঙ্গুরা জনপদে যেন প্রতিযোাগিতায় মেতেছে প্রকৃতি আর জীবনধারা। নেত্রকোণার সর্ব উত্তরে কমলাকান্দার এই সীমান্ত জনপদ আয়তনে মাত্র সাড়ে আট হাজার হলেও রূপবৈচিত্রে দারুন লাস্যময়ী। সবুজ শস্যপ্রান্তর, পাহাড়ের সঙ্গ, বনানীর শোভা এরই মাঝে নিসর্গ ঘেরা জনবসতি। মগ্রা ও কংশ নদীর ধারায় গড়ে ওঠা এ জনপদে গারোদের প্রধান খাদ্য ভাত। ভাতের সঙ্গে মাছ, মাংস, ডাল ও শাকসবজি আহার করে তারা। শুঁটকি মাছ গারোদের অন্যতম প্রিয় খাদ্য। অতিথি আপ্যায়নে, নানা পালাপার্বণে ধেনো পচুঁই মদ গারোদের নিকট অপরিহার্য।

গারোদের সমাজ ব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক। মা-ই পরিবারের কর্তা ও সম্পত্তির অধিকারী এবং এক্ষেত্রে পিতা পরিবারের ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করে। পরিবারের সন্তানসন্ততিরা মায়ের পদবি ধারণ করে। গারোদের প্রথাগত আইন অনুযায়ী পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী মেয়েরা। তাদের পোশাকপরিচ্ছদও বাঙালিদের মতো। পুরুষেরা লুঙ্গি, গেঞ্জি, পাজামা, ট্রাউজার, শার্ট এবং মেয়েরা শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট, সালোয়ার কামিজ ও ওড়না ব্যবহার করে। মহিলাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাকপরিচ্ছদ রয়েছে এবং সেগুলো তারা অনেক সময় ঘরোয়া পরিবেশে ব্যবহার করে। গারোরা এই পোশাককে দক্বান্দা বলে। দক্বান্দায় বিভিন্ন শিল্পকর্ম চিত্রিত থাকে।

উনিশ শতকের শেষদিকে খ্রিস্টান মিশনারিগণ গারোদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচার শুরু করে। ধর্মপ্রচারের শুরুতে তাঁরা গুরুত্বারোপ করে শিক্ষার উপর। বর্তমানে গারো অধ্যুষিত প্রত্যেক গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মিশনকেন্দ্রগুলিতে উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। গারোদের শিক্ষার হার প্রায় ৮০%। শিক্ষায় এবং উন্নয়নে গারো জনগোষ্ঠীরাও পিছিয়ে নেই।

গারোদের মতো হাজংও বাংলাদেশের একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী। ময়মনসিংহ জেলার পর্বত সংলগ্ন ভূমিতে হাজংদের বসবাস। এদের কিছু সংখ্যক নেত্রকোণা অঞ্চলেও বাস করে। গারো ভাষায় ‘হা’ মানে মাটি এবং ‘জং’ মানে পোকা, অর্থাৎ মাটির পোকা। হাজংরা সত্যিই যেন মাটির মানুষ।

দেশভাগের পূর্বে ময়মনসিংহ জেলায় হাজংরা চাষাবাদের মাধ্যমে স্বনির্ভর ছিল। আমিষ ভোজী হাজংদের প্রধান খাদ্য ভাত। তারা মাছ খেতে পছন্দ করে। গোমাংস এবং মহিষের মাংস ছাড়াও তারা বিভিন্ন পশুপাখির মাংস যেমন পাঁঠা, হরিণ, শুকর, ভেড়া, মুরগি, হাঁস, কবুতর ও কচ্ছপের মাংস খেতে পছন্দ করে। বিন্নী চালের ভাত এবং শুঁটকি মাছ তাদের প্রিয়। গারোদের মতো হাজং সমাজেও পঁচুই মদের প্রচলন রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এবং উৎসবাদিতে পঁচুই মদের বেশ ব্যবহার হয়। হাজং নারীরা পৌষ ও চৈত্রসংক্রান্তিতে বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরি করে এবং এইগুলির নাম মুছি পিঠা, পুনি পিঠা, পাতি পিঠা, ডিক্রি পিঠা, চা পিঠা ইত্যাদি।

পিতৃতান্ত্রিক হাজং সমাজের পিতাই মূল নিয়ন্ত্রক এবং মায়ের অবস্থান সেখানে দ্বিতীয়। পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ছেলেরা।

হাজংদের দৈহিক গঠন মধ্যমাকৃতি। দেহ হূষ্টপুষ্ট ও মাংশল। মাথার চুল ঘন ও কালো। তারা বেশ হাসিখুশি স্বভাবের হয়ে থাকে। তাদের দেহে মঙ্গোলীয় ছাপের উপস্থিতি খুব বেশি পরিলক্ষিত হয় না, বরং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বসবাসকারী বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দৈহিক ছাপের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়।

হাজং সমাজ ১৭টি নিকনী বা গোত্রে বিভক্ত ছিল। বর্তমানে হাজং সমাজে এসব নিকনীর অস্তিত্ব বিলুপ্তপ্রায়। নিকনীর পরিবর্তে হাজং সমাজে হিন্দুদের অনুকরণে কাশ্যপ, ভরদ্বাজ, শান্ডিল্য, অসত্বানন্দ প্রভৃতি গোত্রনাম ব্যবহার শুরু হয়েছে। তারা এখন রায়, দাস, সরকার পদবিতে পরিচিত হতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।

একবিবাহ হাজং সমাজে স্বীকৃত প্রথা, তবে প্রথম স্ত্রীর অনুমতিক্রমে পুরুষ দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারে। ছেলেমেয়ে বয়ঃপ্রাপ্ত হলে হাজং অধিকারীর নিকট দীক্ষামন্ত্র নিতে হয়। বিয়ের আলোচনা শুরুর পূর্বে পাত্রপাত্রীর গোত্র অনুসন্ধান করা হয়। একই নিকনী বা গোত্রে হাজং সমাজে বিয়ে হতে পারে না। বরের পিতৃগৃহেই বিবাহ কাজ সম্পন্ন হয় এবং নব দম্পতি সেখানেই বসবাস শুরু করেন। হাজং সমাজে বিধবা বিবাহের প্রচলন আছে।

হদি এবং বানাই আদিবাসীরা এখন বিলুপ্তপ্রায়। সীমান্তের উপজাতিদের মধ্যে রয়েছে ধর্মের ভিন্নতা। তা সত্যেও নেত্রকোণার আদিবাসীদের জীবনযাপন বাংলার সংস্কৃতিতে এনে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা। আদিবাসী জনগণকে আদিম মানুষ, প্রথম জাতি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, উপজাতি, গিরিজন ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। শব্দটির প্রকৃত সংজ্ঞা ও তাদের অধিকার নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু একটি কথা না বললেই নয়, আদিবাসীদের বাংলায় বসবাস আদিকাল ধরেই। তারাই বাংলার বৈচিত্র্য এবং ঐতিহ্য বহনকারী।

পর্যটন শিল্পে নেত্রকোণাঃ

বাংলাদেশ রুপ বৈচিত্রের দেশ । রূপসী বাংলায় রয়েছে অপরুপ সৌন্দর্যের পর্যটন কেন্দ্র। তেমনই এক পর্যটন কেন্দ্র হচ্ছে নেত্রকোণা জেলা। নেত্রকোণাকে মহুয়া মলুয়ার দেশ বলা হয়। কারণ এতে রয়েছে নৈসর্গিক গারো পাহাড়ের পাদদেশ, রয়েছে হাওড়-বাওড়,খাল-বিল, নদী-নালা, ঘাস, ফুল।নেত্রকোণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সুসং দুর্গা পুরের জমিদার বাড়ি। এই জেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে বালিশ মিষ্টি ,শুধুমাত্র এই জেলার ই নয় পুরো বাংলাদেশের আকর্ষণ।

১।গারো পাহাড়ঃ সুসং দুর্গাপুরের উত্তর সীমান্তে নলুয়াপাড়া, ফারড়ংপাড়া, বাড়মাড়ি, ডাহাপাড়া, ভবানীপুর, বিজয়পুর এবং রানিখং সহবিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এর বিস্তার। এই পাহাড়ে প্রচুর পরিমাণে শালগাছ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়। এই পাহাড়্গুলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁধার। প্রকৃতি তার ঝুলি দিয়ে দিয়েছে এ গারো পাহাড়কে সাজাতে। পাহাড়ের মধ্যদিয়ে বয়ে গেছে ঝরনার পানি। পাহাড়ের নিচে রয়েছে সমতল ভূমি। সেখানে রয়েছে পায়ে চলার পথ। যে পথ দিয়ে সেখানকার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতে যায়।

২।ডিঙ্গাপোতা হাওড়ঃ মোহনগঞ্জকে ভাটি বাংলার প্রবেশ দ্বার বলা হয়। আর এই মোহনগঞ্জ অবস্থিত নেত্রকোণায় । মোহনগঞ্জের পূর্বদিক ঘিরেই রয়েছে নান্দনিক সৌন্দর্যের আধার ডিঙ্গাপোতা হাওড়।বর্ষাকালে এই হাওড়ের সৌন্দর্য আরও দিগুন বেড়ে যায়।

৩।সোমেশ্বরী নদীঃ বাংলাদেশ ও ভারতের আন্তঃসীমান্তে এই নদীটি অবস্থিত। এটি ভারতের মেঘালয় ও বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলায় প্রবাহিত একটি নদী।

৪।কমলা রাণীর দিঘীঃ নেত্রকোণার দুর্গাপুরের কমলা রাণী দীঘির কাহিনী অনেক প্রাচীন। জনশ্রুতি আছে সুসং দুর্গাপুরের রাণী কমলা খটখটে শুকনো দীঘির মাঝখানে গিয়ে পূজা দেয়ার সময় বজ্রপাতে দীঘির তলার মাটি ফেটে পানিতে ভরে যায়। এতে সলিল সমাধি হয় রাণীর। কালের আবর্তনে আজ ধ্বংস হয়ে গেছে সেই কমলা রাণীর দীঘি।

কথিত আছে, ১৫ শতকের শেষ দিকে সুসং দুর্গাপুরের রাজা জানকী নাথ বিয়ে করেন কমলা দেবীকে। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে প্রজাদের পানির অভাব মিটানোর জন্য একটি বিশাল দীঘি খনন করেন তিনি।

খনন করা হলেও দীঘিতে পানি ওঠে না। রানী কমলা দেবী স্বপ্নে দেখেন, তিনি যদি দীঘির মাঝখানে গিয়ে পূজা দেন তাহলেই দীঘি পানিতে ভরে উঠবে। স্বপ্নাদেশ পেয়ে রানী পুকুরের মাঝখানে গিয়ে পূজায় বসলেন। হঠাৎ বজ্রপাতে দীঘির তলার মাঠি ফেটে পানি উঠতে লাগলো। পানিতে কানায় কানায় ভরে উঠল দীঘি। সলিল সমাধি হলো কমলা রানীর। বর্তমানে এই দীঘির মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে সোমেশ্বরী নদী। কালের সাক্ষী হয়ে থেকে গেছে পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়। কিছু অংশে রয়েছে ফসলী জমি আর পাড়গুলোতে গড়ে উঠেছে বসতভিটা।

৫।বিরিশিরিঃবিরিশিরির মূল আকর্ষণ হচ্ছে বিজয়পুর চিনামাটির পাহাড় যার বুক চিরে জেগে উঠেছে নীলচে-সবুজ পানির হ্রদ । সাদা মাটি পানির রঙটাকে আরও বেশি গাঢ় করে দিয়েছে।পাহাড় ও সমভূমি মিলিয়ে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৬০০ মিটার। বিরিশিরির পাশেই দুর্গাপুর বাজার। ওই বাজারে পাওয়া যায় নেত্রকোণার বিখ্যাত বালিশ মিষ্টি,যা পুরো দেশে বিখ্যাত।

৬।সুসং দুর্গা পুরের জমিদার বাড়িঃ ১২৮০ খ্রিষ্টাব্দে মেঘালয়ের পূর্ব অংশে সু-সঙ্গ নামে এক পরগনার গোড়াপত্তন হয়। অভিযাত্রী মার্কোপোলো তার অভিযানের এক পর্যায়ে যখন তাঁতার সাম্রাজ্যের সম্রাট কুবলাই খাঁর দরবারে তখনই আরেক অভিযাত্রী সোমেশ্বর পাঠক মতান্তরে সোমনাথ পাঠক ভারতের কান্যকুব্জ থেকে ১২৮০ খৃষ্টাব্দ (৬৮৬ বঙ্গাব্দ মাঘ মাস) পূর্ব ময়মনসিংহের উত্তরভাগ ‍‍’পাহাড় মুল্লুকে’ প্রচুর সঙ্গীসাথী সহ কামরূপ ভ্রমণের লক্ষ্যে বর্তমান দশভূজা বাড়ির প্রাঙ্গনে অশোক বৃক্ষের নিচে বিশ্রামের জন্য যাত্রাবিরতি করেন। অত্র ‘পাহাড় মুল্লুক’ ছিল ‘বৈশ্য গারো’ নামের প্রবল পরাক্রমশালী এবং অত্যাচারী এক গারো রাজার অধীন। সোমেশ্বর পাঠক তাকে যুদ্ধে পরাস্ত করে সু-সঙ্গ অর্থাৎ ভাল সঙ্গ নামে এক সামন্ততান্ত্রিক রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই সোমেশ্বর পাঠকই সুসঙ্গ রাজবংশের আদি পুরুষ।

পরবর্তী তিন’শ বছর এই বংশের রাজ পুরুষগণ বহু উপাধী বদলিয়ে অবশেষে সিংহ উপাধী ধারণ করেন। এই রাজবংশের যোগ্য উত্তরসূরী মল্লযোদ্ধা এবং প্রখর কূটনৈতিক জ্ঞানের অধিকারী রাজা রঘুনাথ সিংহ মোঘল সম্রাট আকবরের সিংহাসন আহরণর পর তাঁর সাথে এক চুক্তি করেন। এই চুক্তির অংশ হিসেবে রাজা রঘুনাথ সিংহকে মানসিংহ এর পক্ষে বিক্রমপুরের চাঁদ রায়, কোদার রায় এর বিপক্ষে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে হয়। যুদ্ধে চাঁদ রায়, কেদার রায় পরাস্থ হলে রাজা রঘুনাথ সেখান থেকে অষ্ট ধাতুর এক দুর্গা প্রতিমা নিয়ে আসেন এবং রাজ মন্দিরে স্থাপন করেন যা আজও দশভূজা মন্দির নামে সুপরিচিত। তখন থেকেই সু-সঙ্গের সাথে দুর্গাপুর যোগ করে এই অঞ্চলের নামকরণ হয় সুসঙ্গ দুর্গাপুর৷ এক সময় দুর্গাপুর ছিল সুসং রাজ্যের রাজধানী। ৩ হাজার ৩শ’ ৫৯ বর্গমাইল এলাকা ও প্রায় সাড়ে ৯শ’ গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত সুসং রাজ্যের রাজধানী ছিল দুর্গাপুর। বর্তমানে এটি নেত্রকোণার একটি উপজেলা।

৭।ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমীঃ আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহু প্রাচীন ও মনোগ্রাহী। এ সকল জনগোষ্ঠী আদিকাল হতেই স্থানীয় সহযোগিতা নিয়ে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে চর্চার মাধ্যমে লালন ও সংরক্ষণ করে আসছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্টপূর্ণ আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০’ কার্যকর করা হয়। উক্ত আইন অনুসারে বর্তমানে বিরিশিরি কালচারাল একাডেমী পরিচালিত হচ্ছে।

৮।টংক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধঃ বৃটিশ ও জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের দাবীতে বৃহত্তর উত্তর ময়মনসিংহের কৃষকগণের সংগ্রাম কৃষক বিদ্রোহ ও টংক আন্দোলন নামে পরিচিত। আন্দোলনের প্রাণ শক্তিই ছিল আদিবাসী কৃষকগণ। তাঁদের এ মহান আত্মত্যাগের স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধা স্বরুপ সুসং দুর্গাপুরে এম.কে.সি.এম সরকারী স্কুলের পশ্চিম পার্শ্বে ৩২ শতাংশ জমির উপর টংক শহীদ স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করা হয়। এখানে প্রতি বছর ৩১শে ডিসেম্বর মহান নেতা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কমরেড মনি সিং এর মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হয়। মনিমেলা নামে এ অনুষ্ঠান ৭ দিন যাবৎ চলে।

বৃটিশ ও জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের দাবীতে বৃহত্তর উত্তর ময়মনসিংহের কৃষকগণ ১৯৩৬ হতে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত সংগ্রাম আন্দোলন চালিয়ে যায়। এটি কৃষক বিদ্রোহ ও টংক আন্দোলন নামে পরিচিত। আন্দোলনের প্রাণ শক্তিই ছিল আদিবাসী কৃষকগণ, বিশেষ করে হাজং আদিবাসীগণ (ললিত সরকার হাজং, বিপিন গুন, পরেশ হাজং, রেবতী অস্বমনি ও রাশমনির নেতৃত্বে এ আন্দোলন সংগঠিত হয়)। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও মেহনতি মানুষের নেতা কমরেড মনি সিংহ ১৯৪০ সালে দশাল গ্রামের বাঙ্গালী কৃষকদেরকে নিয়ে এ আন্দোলন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। সূদীর্ঘ ১৩ বছর আন্দোলন সংগ্রামে এ অঞ্চলের বহু কৃষক প্রাণ হারান।

৯।সাধু যোসেফের ধর্মপল্লীঃ সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী। নেত্রকোণা সদর থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি এই এলাকাটির অবস্থান। এখানে রয়েছে রানীখং টিলা এবং এর উপর নির্মিত প্রাচীন রানীখং মিশন। সোমেশ্বরীর তীরে এই মিশনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ক্যাথলিক একটি গ্রাম। স্থানীয়ভাবে যার সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী। রানীখং মিশনের স্থাপত্য ধরণ, ধর্মীয় স্থাপত্যগুলো মুগ্ধ করবে আপনাকে। সাথে এখানে ক্যাথলিক ধর্ম বিস্তারের ইতিহাস জেনে ভালো লাগবে। বিভিন্ন সূত্র মতে, এই স্থানের গারো সম্প্রদায় বিশ্বের প্রথম ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত গারো সম্প্রদায়।

১৯১১ সালের ১৯ মার্চ এডলফ ফ্রান্সিস নামের একজন ফাদার প্রথম একদল গারো নারী-পুরুষকে খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষা দেন। তার মাধ্যমেই এখানে খৃষ্ট ধর্ম প্রচার এবং বিস্তার লাভ করে। রানীখং মিশন ও ক্যাথলিক গীর্জা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে।

এসব মিলিয়েই নেত্রকোণার পর্যটনকেন্দ্র। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়। যা নেত্রকোণা জেলাকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তুলবে এবং অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করবে।

নেত্রকোণার আঞ্চলিক গান ও লোকজ সংস্কৃতিঃ

“মাঝি বাইয়া যাও রে

অকুল দরিয়ার মাঝে

আমার ভাঙা নাও রে।।“

এরকম আরও হাজারো বাউল, ভাটিয়ালী, জারি, সারি, পালাগান, ঘেটুগান ওতপ্রোতভাবে মিশে রয়েছে বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে । একটি দেশের বা একটি জাতির আত্মপরিচয় তার লোকসংস্কৃতি৷ আর বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিই এ দেশের মূল সংস্কৃতির ভিত্তি। তার মধ্যে লোকসাহিত্য-সংস্কৃতির নানা উপাদান-অনুষঙ্গে সমৃদ্ধ এক জনপদ নেত্রকোণা।

নেত্রকোণা সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকসংস্কৃতির মধ্যে একটি হলো ঘাটু গান। কোথাও কোথাও শব্দটিকে ঘাঁটু, ঘেটু, ঘেঁটু, গেন্টু, ঘাডু, গাড়ু, গাঁটু বা গাডু বলা হয়। তবে নেত্রকোণা অঞ্চলে এটি ‘ঘাটু’ এবং ‘গাডু’ নামেই বহুল প্রচলিত। ঘাটু গানের নামকরণের ইতিহাসও একেকজনের বর্ণনায় একেক রকম। নেত্রকোণার স্থানীয় লোক সাহিত্য সংগ্রাহক গোলাম এরশাদুর রহমান তার ‘নেত্রকোণার লোকগীতি পরিচয়’ গ্রন্থে বলেছেন-

স্থানীয়ভাবে আদিকালের সমঝদারদের বক্তব্য ছিল- কৃষ্ণের বাঁশির ঘাট শব্দ থেকে ঘাটু নামকরণ হয়।

যতীন সরকার রচিত ‘সিরাজুদ্দিন কাশিমপুরী’ জীবনীগ্রন্থে আমরা জানতে পারি-

পশ্চিমা কুলিদের মুখে শব্দটির উচ্চারণ ‘গাণ্টু’। শব্দটির আঞ্চলিক উচ্চারণভেদ পর্যালোচনা করে তিনি ধারণা করে নিয়েছেন- এই শব্দের মূল অনুসন্ধান করিলে আমরা দুইটি শব্দ পাই- ‘গান’ আর ‘ঘাট’। গান+টু=গাণ্টু>গাঁটু, আর ঘাট+উ=ঘাটু। দু’টো শব্দের আনুপূর্বিক আলোচনা শেষে তিনি ‘গাটু’ শব্দটিকেই গ্রহণীয় বলে বিবেচনা করেছেন।

আলোচনার ভিত্তিতে বলা হয় যে, ঘাটু গানের উৎপত্তিস্থল হচ্ছে সিলেটের আজমিরিগঞ্জ এবং এর উৎপত্তিকাল ষোড়শ শতকের প্রথমভাগ।

বিশ শতকের প্রায় শেষ দিকে ঘাটু গান সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।

বাউল, ভাটিয়ালী, জারি, সারি, ধামাইল গান কোনো কিছুরই কমতি নেই এখানে।

যাত্রাশিল্পের এক সময় জয়জয়কার পরিস্থিতি ছিল নেত্রকোণায়। স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, স্মার্ট মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগের কারণে যাত্রাশিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। প্রযুক্তির ব্যবহারে দুনিয়া এগিয়েছে বটে, তবে প্রযুক্তি কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রামীণ ঐতিহ্য-সংস্কৃতির পেশাকে ক্ষতিগ্রস্তও করেছে।

নেত্রকোণা অঞ্চলের লোকছড়া, প্রবাদ-প্রবচন, লোকধাঁধাঁ ও শিলুক, বিয়ের গান, মেয়েলী গীত, বৃষ্টির গান, বারোমাসী গান, আমতলার সঙযাত্রা, লোকমেলা, ঘুড়ি উৎসব, কীর্তন, ফসল কাটা-ফসল তোলা, ধান ভানার গান, বাউল-মুর্শিদী, দেহতত্ত্ব, মারফতি, ভাটিয়ালী, পক্ষী শিকারের গান (কোড়া শিকার), পুঁথি পাঠ, হালকার গান, আঞ্চলিক গান, কবিগান, পল্লী গান, ফকিরালী জিকির গান, খেয়ালী ও রাখালী গান, পালা-গীতি, পাড়া-গায়ের ছড়া, দরবারী শিলুক, পালাগীতি অভিনয়, সাপের মন্ত্র, বারনী-আড়ং, ষাড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, চৈত্র সংক্রান্তিতে মশা-মাছি তাড়াবার আনুষ্ঠানিকতা, গিমাই শাক রান্না, মন্ত্রের বুলি আউরিয়ে শোলা দিয়ে দাদা-দাদী সম্পর্কীয়দের পেটানো, লোক-কাহিনি নির্ভর কিচ্ছা,পালাগান,যাদু টোনা মন্ত্র,গাইনের গীত,হিরালী,পালকির গান এসব অধিকাংশেরই সামাজিক জীবনে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা থাকলেও তা হারিয়ে যাচ্ছে।

বাউল, ভাটিয়ালী, জারি, সারি, কবিগান, পালাগান, ধামাইল গান কোনো কিছুরই কমতি নেই এখানে। নেত্রকোণার আব্দুল কুদ্দুছ বয়াতী, বাংলাদেশের একজন সেরা বয়াতী। সিরাজ উদ্দীন খান, নেত্রকোনার অন্ধ-বাউল, তিনি বাউল কানা সিরাজ নামে সুপরিচিত ।

নেত্রকোণা জেলায় আদিবাসীদের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস। এ জেলার কলমাকান্দা, দূর্গাপুর ও পূর্বধলা উপজেলায় ছয়টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির প্রায় দেড় লক্ষাধিক আদিবাসী বাস করে। যেমন গারো, হাজং , কোচ। তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যেনো আরও একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে নেত্রকোণার সংস্কৃতিতে।

নেত্রকোণার সংস্কৃতিতে হাওড়-বাওড়ঃ

বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বলা হয়,আবার কেউ হাওড়-বাওড়ের দেশ ও বলে থাকেন। ষড়ঋতুর সৌন্দর্য্য মন্ডিত ধন-ধান্য পুষ্পে ভরা আমাদের সোনার বাংলাদেশ।অনুপম এই সৌন্দর্য কে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে দেশজুড়ে বিস্তৃত অসংখ্য হাওড়-বাওড়।ষড়ঋতুর পরিবর্তনের সাথে সাথে, এদেশের হাওড়-বাওড়েরও রূপের পরিবর্তন হয়।হাওড়ের কথা বলতে গেলে সবার আগে সাগরের দৃশ্য মনে পড়ে।কালক্রমে উচ্চরণ বিবর্তনে সাগর থেকে সায়র এবং পরে সায়র থেকে হাওড় এর সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে।হাওড়ের জলরশি ভেদ করে রঙ্গিম সূর্য উদিত হয় এবং রক্তিম সূর্যটি জলেই ডুবতে দেখা যায়।শিরা-উপশিরার ন্যায় পেচিয়ে থাকা এসব হাওড় -বাওড় বর্ষাকালে সাগরের ন্যায় বিস্তৃত জলরাশিতে পরিণত হয়।বর্ষাকালে যেখানে অথৈ জলে মাঝিদের দাঁড় বাইতে বাইতে সুরেলা কণ্ঠে গান গায়তে শোনা যায়, শুকনো মৌশুমে সেখানেই চোখে পড়ে একদম বিপরীত দৃশ্য।মাইলের পর মাইল যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ ধানের ক্ষেত আর ধু-ধু প্রান্তর ই দেখতে মিলে।এ কারণেই বলা হয়ে থাকে-

বর্ষায় নাও, শুকনায় পাও

এইডাই উজান-বাড়ির বাও

বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় ৭ টি জেলা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ,সিলেট, মৌলভীবাজার এবং ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য হাওড়-বাওড়।

নেত্রকোণা জেলায় মোট ৮০ টি হাওড় আছে।এর মধ্যে অন্যতম হল মোহনগন্জের ডিঙ্গাপোতা, কেন্দুয়া উপজেলার জালিয়ার হাওর।জালিয়ার হাওড় একসময় জলমহালের আওতায় ছিল।প্রাকৃতিক কারণে এখানকার অনেক হাওড় ভরাট হয়ে গেছে। অবশিষ্ট হাওড় গুলাই বর্তমানে নেত্রকোণার সৌন্দর্যকে প্রাণ সঞ্চার করে রেখেছে।

আর এমন একটা সুন্দর হাওড়-বাওড় ঘেরা পরিবেশে তৈরি হচ্ছে শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় যা ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার জন্য একটা মনোরম পরিবেশ যোগান দিবে।